নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা: বর্তমান পরিস্থিতি, আইন ও করণীয় বিষয়ক মতবিনিময় সভার প্রতিবেদন
তারিখ: ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩/ ২৮ নভেম্বর ২০১৬
স্থান: সম্মেলন কক্ষ, জেলা জজ আদালত, জয়পুরহাট
আর্থিক সহায়তায় : মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
আয়োজনে : নারীপক্ষ ও হার্টকোর পিপলস ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এইচ.পি.ডি.ও), জয়পুরহাট

নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম এবং জনগণের অংশগ্রহণ জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩/ ২৮ নভেম্বর ২০১৬ সম্মেলন কক্ষ, জেলা জজ আদালত, জামালপুরে “নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা: বর্তমান পরিস্থিতি, আইন ও করণীয় বিষয়ক” মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব মাহাবুবা বেগম, নিবার্হী পরিচালক, হার্টকোর পিপলস ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এইচ.পি.ডি.ও), জয়পুরহাট। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন জনাব আব্দুর রহিম মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ। সঞ্চালোকের দায়িত্ব পালন করেন নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা।
মতবিনিময় সভাটি যৌথভাবে আয়োজন করে হার্টকোর পিপলস ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এইচ.পি.ডি.ও), জয়পুরহাট এবং নারীপক্ষ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদানকরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

সভার উদ্দেশ্য : পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ সম্পর্কে সংশ্ল্টি পক্ষকে অবহিত করা এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী যাতে এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা ও ন্যায় বিচার পায় সেই করণীয় চিহ্নিত করা।

অংশগ্রহণকারী : সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জনাব, আব্দুর রহিম মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ, জয়পুরহাট। সভায় সম্মনিত অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী জজ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, পুলিশ, এনজিও প্রতিনিধি সহিংসতার শিকার নারী এবং সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও নাজমা বেগম, সদস্য, নারীপক্ষ, রওশন আরা, প্রকল্প পরিচালক, নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম এবং জনগণের অংশগ্রহণ জোরদারকরণ প্রকল্প, নাজমুন নাহার, প্রোগ্রাম অফিসার, এবং হার্টকোর পিপলস ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এইচ.পি.ডি.ও), জয়পুরহাট এর নির্বাহী পরিচালক মাহাবুবা বেগম, সভানেত্রী, প্রকল্প কর্মকর্তা এবং মাঠ সহায়তাকারী সভায় অংশগ্রহণ করেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্য ও সংগঠনের সংক্ষিপ্ত ধারনা প্রদান: এইচপিডিও সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক মাহবুবা বেগম সকলকে বিকালের শুভেচ্ছা জানিয়ে সভা শুরু করেন। সংগঠন ১৯৪৭ সালে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করে আসছে। নারীর অধিকার, মানবাধিকার, নির্যাতনের শিকার নারীর সুরক্ষা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি বলেন পারিবারিক সুরক্ষা আইন ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ২০১২ সালে বাস্তবায়নের জন্য আইন পাশ করা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এই আইনের বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে সেকারণে ‘পারিবারিক সহিংসতাঃ বর্তমান পরিস্থিতি, আইন ও করণীয় বিষয়ের উপর আজকের আলোচনা।

উন্মুক্ত আলোচনা : উন্মুক্ত আলোচনায় সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন রওশন আারা, প্রকল্প পরিচালক, নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম এবং জনগণের অংশগ্রহণ জোরদারকরণ প্রকল্প। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের মতামত নি¤œরুপÑ

মোঃ ইকবালক (অতিরিক্ত চীপ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট): স্বামী দ্বারা শারিরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার নারী স্ত্রী থাকা কালে এই আইনে মামলা করতে থাকবে। পারিবারিক আদালতে যৌতুকের জন্য মামলা করতে হবে।

এ্যাডভোকেট. নৃপেন (পিপি): এই আইন বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রচার করতে হবে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হলে একই বাড়িতে থেকে স্ত্রীকে কিভাবে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। নারীর নিরাপত্তা কে দিবে। আইনে তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নেই। আইনিক দূর্বলতা রয়েছে। আইনটাকে শক্তিশালী করতে হবে। এই আইন দিয়ে সুরক্ষা কতটা দিতে পারছে তা দেখতে হবে। সুরক্ষা না পেলে তারা অন্য আইনে আশ্রয় নিতে হবে। এই সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

মনিরুল ইসলাম, ওসি, ক্ষেতলাল: এই আইন সম্পর্কে আমি জানিনা কখন শুনিনি। এই আইন প্রয়োগ যদি সহজ হয় তাহলে আমরা থানায় চেষ্টা করব। আমরা দেখেছি সহজে কোন নারী মামলা করতে চায় না। আবার মামলা করলে স্বামীর ঘরে থাকতে পারবে না বলে ভয় পায়, পারিবারিক সহিংসতা সুরক্ষা আইন অনেক সময় সব সমস্যা সমাধান হবে না।

অপূর্ব সরকার, নির্বাহী পরিচালক, ডিএমএসএস: আমরা এনজি’রা কাজ করি নারীদের সচেতন করার জন্য, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলি। সমাজ পরিবর্তনে কাজ করি। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের উপর তারা আইনটি সম্পর্কে ভালো ভাবে জানে না এবং এই আইনের প্রচার নাই। তাই জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে, আইনের প্রচার করতে হবে।

সাংবাদিক সাজু (ইত্তেফাক): নারী নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলছে। সংবাদ পত্রে যারা কাজ করছি আমরা সহিংসতা প্রতিরোধ ভ‚মিকা রাখতে পারি। এই আইনে যারা বিচার পাচ্ছেনা এমন স্টাডি আমাদের দিলে যারা উদাহরণ হিসেবে সমাজের কাছে আমরা তুলে ধরতে পারি। তাহলে বিচার কার্য সহজ হবে। নারীরা লাভবান হবে।

লায়লা নাসরিন (মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা): এই আইন সম্পর্কে আমরা প্রশিক্ষণ পেয়েছি। আমরা যা জেনেছি এটা আইন, মামলা বলা যাবে না। এই আইনে সুরক্ষার কথা বলা হযেছে, আমরা নারীরা দুর্বল, পরিবারে ও রাষ্ট্রে। অনেক বাধা। নারীরা বিচারের জন্য মামলা করতে হলে সব ত্যাগ করতে হবে। এই মামলায় কোটে না পাঠিয়ে যদি কর্মকর্তা বুঝিয়ে মিমাংসা করার সুযোগ থাকতো তাহলে ভাল হতো। আইনে নারীর সুরক্ষা দেওয়া উচিত। আইনে কি বলা আছে সেটা বিষয় নয়। ২০১০ সালে এই আইনটি প্রনয়ন হয়েছে কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।
ইসমত আরা (চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট): যৌতুক নিরোধ আইনের সাথে সম্পৃক্ত করে অন্তবর্তীকালীন সুরক্ষা দিতে পারি। বিজ্ঞ পরামর্শ থাকল। আইনের সমালোচনা নয় সুরক্ষা কিভাবে দেওয়া যায় তা সাক্ষী সাবুদের ক্ষেত্রে এই আইনটির সংশোধন আনা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

মোমিন আহমেদ চৌধুরী, জিপি: আমাদের দেশের পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে অনেক নারী নেত্রীরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। নারীদের সমস্যা নিয়ে তাদের নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে। নারী নেত্রীরা এই আইন নিয়ে কাজ করছে। আইনটি কিভাবে আরও বাস্তবমুখী করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। আইন সম্পর্কে অনেকে জানে না সেকারণেও এই পারিবারিক আইনে মামলা কম। পারিবারিক আইনের প্রচার প্রসার বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। এই আইনটি খুব দুর্বল তবে এর ভাল দিক রয়েছে বলে আমরা মনে করি সেকারণে এই আইনটি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

অতিরিক্ত দায়রা জজ ড.আব্দুল মজিদ বলেন, সাড়া পৃথিবীতে নারী নির্যাতন কিভাবে মোকাবেলা করা যায় তার জন্য সিডিও সনদ তৈরী হয়েছে। অনেক দেশের মধ্যে আমাদের দেশের সিডিও সনদ ঠিকমত মানা হয়নি। বাংলাদেশের নির্যাতনের মাত্রা বেশি। এই আইনের বাস্তবায়ন কতটুকু সেটা দেখতে হবে। ১টি নারী ৭/৮ মামলা করে। বাংলাদেশে নারীদের জন্য অনেক আইন তৈরী হয় কিন্তু আইনের প্রয়োগ সঠিক ভাবে হয় না। আইনটি কিভাবে আরও বাস্তবমুখী করা যায়। আইন সম্পর্কে অনেকে জানে না। আইনের প্রচার বৃদ্ধি করতে হবে।

আব্দুর রহিম, মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ: আমাদের এই আয়োজনে পারিবারিক সুরক্ষা আইন জনগণের দৃষ্টিপাত করেছে। আমরা বিচারক, আইনজীবী এই আইনের সাথে সম্পর্কিত থেকে আইন সম্পর্কে আলোচনা করা হয় না। আলোচনার মাধ্যমে সুযোগ উম্মোচন হয়েছে। আইন জানার ক্ষেত্রেও অনেক ত্রæটি রয়েছে। এই সেমিনারের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে কোটে সকল আইনের আলোচনা করার সুযোগ হয় না। সহিংসতার মধ্যে কোনটা পড়বে তা চিহ্নিত করতে হবে। গ্রামের নারী ও ঢাকার গুলশানের নারীর সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য দেখতে হবে। আইনের সমালোচনা করতে হবে এবং তার সংশোধন করতে হবে। এই আইনের প্রচার না থাকায় জনগণ যেমন এই আইনের সুবিধা সম্পর্কে জানে না অপরদিকে আইনজীবীরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী আসলে সুরক্ষার জন্য কোন পদক্ষেপ নেন না। এই আইনের সঠিক প্রয়োগে হলে সংসার টিকে থাকবে, সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। তাই সেবা প্রদানকারী সংস্থা, প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, পুলিশ এবং বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সং¤িøষ্ট সকলকে আন্তরিক হতে হবে।

পরিশেষে, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ বাস্তবায়নের জন্য সেবা প্রদানকারী সংস্থা, প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, পুলিশ এবং বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সং¤িøষ্ট সকলের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। সেই সাথে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই আইনটি সুয়োগ সম্ভাবনা গুলো প্রচার করলে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। পরিবারের মধ্যে নিরাপদে বসবাস করে নারী যেন তার নায্য বিচার পায় সেই জন্যই এই আইন। কাজেই পারিবারিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না বরং পারিবারি বন্ধন অটুট রাখার জন্যই এই আইনটির প্রচার এবং বাস্তবায়নে আমাদের সকলকে আন্তরিক, দায়িত্বশীল এবং এগিয়ে আসতে হবে।

প্রস্তুতকারী:
প্রকল্প কর্মকর্তা
সাদিয়া শারমীন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *